মহাসড়কের পাশে ট্রমা সেন্টার, তবুও আহতদের ছুটতে হয় ৪০ কি.মি. দূরে

প্রকাশ: October 11, 2026




ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ২০ শয্যার ট্রমা সেন্টার। উদ্দেশ্য ছিল সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া। কিন্তু উদ্বোধনের ১৯ বছর পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি ময়মনসিংহের ভালুকা ট্রমা সেন্টার। জনবল সংকটে বন্ধ রয়েছে রোগী ভর্তি ও অস্ত্রোপচার কার্যক্রম। ফলে মহাসড়কে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হচ্ছে।

জানা গেছে, ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চত্বরে ২০০৭ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনতলা ভবনের ট্রমা সেন্টারটি উদ্বোধন করা হয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের শেষ দিকে সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সেখানে অর্থোপেডিক পরামর্শ, এক্স-রে, ইসিজি ও প্রাথমিক প্লাস্টারের মতো সেবা দেওয়া হচ্ছে।

তবে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় এসব সেবা যথেষ্ট নয়। ট্রমা সেন্টারটিতে রোগী ভর্তি ও অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা চালু না থাকায় জরুরি রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের প্রথম তলায় বহির্বিভাগের কার্যক্রম চললেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা প্রায় অব্যবহৃত। তৃতীয় তলার কক্ষগুলোতে পড়ে রয়েছে অক্সিজেন সিলিন্ডার। সিঁড়ির পাশ ও ছাদে রাখা হয়েছে বেড, অ্যাম্বুলেন্স, চেয়ারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় এসব সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে।

ট্রমা সেন্টার চালুর সময় সরবরাহ করা প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ বা বিকল হয়ে গেছে। অপারেশন থিয়েটারের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও জেনারেটরও নষ্ট হয়ে আছে।

অথচ প্রতিদিনই এখানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী আসছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রতিদিন বহির্বিভাগে ২০০ থেকে ২৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। চলতি বছরেই বহির্বিভাগ থেকে ২৬ হাজারের বেশি রোগী সেবা নিয়েছেন। সেদিন দুপুর ২টা পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছেন ১৮২ জন।

রোগীদের অভিযোগ, বড় ভবন ও চিকিৎসার অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও এখানে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা ভোগান্তি আরও বাড়াচ্ছে।

এদিকে জনবলসংকটকে ট্রমা সেন্টারটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালুর প্রধান বাধা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জনবল কাঠামো অনুযায়ী, এখানে ৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজন। এর বিপরীতে বর্তমানে রয়েছেন মাত্র তিনজন চিকিৎসক, ১১ জন নার্স, একজন এক্স-রে টেকনিশিয়ান ও একজন ফার্মাসিস্ট।

কাগজপত্রে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অর্থোপেডিকস) মো. সোহেল রানা, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) সুলতান ফজলে রাব্বী এবং আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) মোহাম্মদ মামুনুর রশীদসহ ১১ জন নার্স, একজন এক্স-রে টেকনিশিয়ান ও একজন ফার্মাসিস্টের পদ রয়েছে। তবে ২৪ ঘণ্টা ইনডোর সেবা চালানোর জন্য আলাদা কোনো ডিউটি চিকিৎসকের পদ নেই।

অন্যদিকে ভালুকা অংশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কম নয়। ভালুকা ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে মহাসড়কটির ভালুকা অংশে ৬৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫১ জন এবং নিহত হয়েছেন সাতজন।

এমন পরিস্থিতিতে মহাসড়কের পাশে থাকা ট্রমা সেন্টারটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না থাকায় গুরুতর আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। দুর্ঘটনার পর তাদের প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হচ্ছে।

ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ফখরুল হাসান চৌধুরী বলেন, ট্রমা সেন্টারের ইনডোর ও আউটডোর সেবা পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন করা সম্ভব হলেই দ্রুত ইনডোর সেবা ও অপারেশন থিয়েটার চালু করা যাবে।