একসময় বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর একটি ছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। এখন সেই ব্যাংকই তীব্র তারল্য সংকট, বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি এবং ধারাবাহিক লোকসানে বিপর্যস্ত। গত দুই বছরে ব্যাংকটির আমানত কমেছে ৬ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ২৯ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ জুনের তথ্যেও ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ ছিল।
২০২৪ সালের জুন শেষে ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানত ছিল ৪০ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। বিপরীতে একই সময়ে ব্যাংকের ঋণের স্থিতি ৪৩ হাজার ২১০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৩ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি খেলাপি ঋণে। ২০০৯ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ৩৮৮ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুন শেষে তা বেড়ে হয় ২০ হাজার ৯২৯ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ২৮ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। জুলাইয়ে তা আরও বেড়ে হয়েছে ২৯ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা। মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৬৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
আমানত কমে যাওয়া ও তারল্য সংকটের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত নগদ জমার হার (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ তরল স্থিতি (এসএলআর) রাখতে পারছে না ন্যাশনাল ব্যাংক।
জুলাই পর্যন্ত ব্যাংকটির এসএলআর ঘাটতি ছিল ৪ হাজার ২২৩ কোটি টাকা এবং সিআরআর ঘাটতি ১ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। এ দুই ঘাটতির কারণে এখন পর্যন্ত ব্যাংকটিকে জরিমানা গুনতে হয়েছে ১ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা।
ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান আহমেদ গত ১২ আগস্ট বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন মন্তব্য ও আস্থার সংকটে ব্যাংকটিতে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে সেই চাপ অনেকটাই কমেছে। তবে এখনো প্রত্যাশা অনুযায়ী সব গ্রাহককে অর্থ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণের বড় অংশই আটকে আছে শীর্ষ ২০ গ্রুপের কাছে। গত ডিসেম্বর শেষে এসব গ্রুপের ঋণস্থিতি ছিল ২১ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় অর্ধেকই রয়েছে মাত্র ২০ গ্রুপের কাছে।
এর মধ্যে মাইশা গ্রুপের ঋণ ২ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা, বসুন্ধরা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৪ হাজার ১৭৮ কোটি, বেক্সিমকো এলপিজি ও বেক্সিমকো গ্রুপের ২ হাজার ১৪৭ কোটি, নাসা গ্রুপের ১ হাজার ৯৫৭ কোটি এবং এফএমসি গ্রুপের ১ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা।
এ ছাড়া সাইফ পোর্ট হোল্ডিং ও সাইফ পাওয়ারটেকের ১ হাজার ৫৭৪ কোটি, সাদ মুসা গ্রুপের ১ হাজার ১৭৭ কোটি, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের ১ হাজার ৯৫ কোটি এবং ব্লুম সাকসেস ইন্টারন্যাশনালের ৯০৩ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে।
ইমরান আহমেদ বলেন, ব্যাংকের ঋণের বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। সম্পদের একটি বড় অংশ চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো উদ্ধারে একটি আন্তর্জাতিক অডিট ফার্মকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
খেলাপি ঋণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যাংকের প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি। ২০২৪ সালের জুন শেষে ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১৪ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুলাই শেষে তা বেড়ে হয়েছে ২৩ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ব্যাংকের প্রকৃত মূলধন ঘাটতি ২০ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা।
ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পুরোনো ঋণ থেকে অর্থ আদায় না হওয়া এবং নতুন করে মূলধন না আসায় ঘাটতি কমছে না। বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের পাশাপাশি ব্যাংকে নতুন মূলধন জোগান প্রয়োজন।
২০২১ সাল পর্যন্ত লাভজনক ছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। এরপর শুরু হয় ধারাবাহিক লোকসান। ২০২২ সালে ব্যাংকটির লোকসান হয় ৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে ১ হাজার ৪৯৭ কোটি, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৭০৬ কোটি এবং ২০২৫ সালে ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা।
ব্যাংকের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় সুদ আয় না হওয়া এবং তারল্যের চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ নেওয়ার কারণে সুদ ব্যয় বাড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
সংকটের মধ্যেই ২০২১ সালে সাত গ্রাহকের প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার সুদ মওকুফ করে ন্যাশনাল ব্যাংক। এসব ঋণের বিপরীতে আগের প্রায় ১০ বছর ধরে সুদ আরোপ করা হয়েছিল।
ব্যাংকটির চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও ঢাকার গুলশান শাখা ২০০৩ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে ওই সাত প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছিল। বড় অঙ্কের সুদ একদিনে মওকুফের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও নির্দিষ্ট শর্তে অনাপত্তি দিয়েছিল।
ব্যাংক-সংশ্লিষ্টদের মতে, খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকের এত বড় অঙ্কের সুদ মওকুফ আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।
২০০৯ সালে জয়নুল হক সিকদার ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে সিকদার পরিবারের হাতে চলে যায়। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের পর্ষদে যুক্ত করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ রয়েছে।
ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, ওই সময়ে প্রভাবশালী গ্রাহকদের সুবিধা দিতে ঋণ বিতরণ, ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ এবং নামে-বেনামে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এর ফলে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন পর্ষদ গঠন করে। চেয়ারম্যান হন ব্যাংকটির পুরোনো উদ্যোক্তা আবদুল আউয়াল মিন্টু। পরে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় চেয়ারম্যান পদ ছাড়েন। ২০২৬ সালের মার্চে চেয়ারম্যান হন অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবিন।
নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু হলেও আর্থিক সূচকে এখনো তার প্রতিফলন নেই।
ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবিন গত ১২ আগস্ট বলেন, তারা ব্যাংকটিকে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় পেয়েছেন। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কাজ চলছে। তার ভাষায়, বহু বছর ধরে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া একটি ব্যাংকের পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বর্তমান পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করে ব্যাংক পরিচালনার চেষ্টা করছে। এখন সবচেয়ে বড় কাজ গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠন করা।