পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রস্তাবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ারের বরাদ্দ বাড়ানো, সম্পদশালী বিনিয়োগকারীদের পৃথক কোটা বাতিল, নতুন শেয়ার ইস্যুর পাশাপাশি বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির সুযোগ এবং বড় কোম্পানির তালিকাভুক্তির শর্ত শিথিল করার কথা বলা হয়েছে।
এ জন্য ‘পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ রুলস, ২০২৫’-এর সংশোধনীর খসড়া প্রকাশ করেছে বিএসইসি। আগামী ২ নভেম্বর পর্যন্ত এ খসড়ার ওপর মতামত ও সুপারিশ নেওয়া হবে।
খসড়া অনুযায়ী, ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ারের বরাদ্দ ৬০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ শতাংশ এবং বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ৩৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে, বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া ইস্যুয়ার কোম্পানির কর্মীদের জন্য বরাদ্দ ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ এবং অনাবাসী বাংলাদেশিদের (এনআরবি) জন্য ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, সম্পদশালী বিনিয়োগকারীদের পৃথক কোটা তুলে দেওয়া হলে তাঁরাও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একই বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে নতুন শেয়ার ইস্যুর পাশাপাশি উদ্যোক্তা বা বিদ্যমান শেয়ারধারীদের শেয়ার বিক্রির সুযোগ রেখে হাইব্রিড পদ্ধতিতে আইপিও চালুর কথা বলা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে আইপিও-পরবর্তী পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ৫ শতাংশ নতুন শেয়ার ইস্যু করতে হবে। পাশাপাশি বুক বিল্ডিং পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। তবে এ সুযোগ পেতে কোম্পানিকে নির্দিষ্ট আর্থিক শর্ত পূরণ করতে হবে।
বড় কোম্পানির তালিকাভুক্তির শর্ত শিথিল করারও প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে ৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি নিট সম্পদসম্পন্ন কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির জন্য আইপিও-পরবর্তী পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়তে হয়। খসড়ায় এ হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৫০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদসম্পন্ন নতুন কোম্পানিকে লোকসানে থাকলেও নিরীক্ষকের মাধ্যমে যাচাই করা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা জমা দিয়ে আইপিওর আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ার বরাদ্দের নিয়মেও পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা কাট-অফ প্রাইসে শেয়ার পান। নতুন প্রস্তাবে তাঁদের প্রস্তাবিত দর অনুযায়ী শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হবে। সর্বোচ্চ দরদাতার বরাদ্দ দিয়ে শুরু করে ক্রমান্বয়ে কম দরদাতাদের শেয়ার দেওয়া হবে। যে সর্বনিম্ন সফল দরে বরাদ্দ সম্পন্ন হবে, সেটিই হবে কাট-অফ প্রাইস। অন্যদিকে, ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে অভিহিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে শেয়ার ছাড়ার সুযোগ বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আইপিওর আবেদন জমা দেওয়ার আগে কোম্পানির আর্থিক ও করপোরেট তথ্য স্বাধীন নিরীক্ষকের মাধ্যমে যাচাই বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও রয়েছে। এ ছাড়া বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের লক-ইন বা বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞার নিয়ম পরিবর্তন এবং আইপিওর অর্থ দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যাংকঋণ পরিশোধের সীমা ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ বলেন, অতীতে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে দর নির্ধারণে উদ্যোক্তাদের প্রভাব ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা অযৌক্তিক দর প্রস্তাব করেছেন। ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতেও অনিয়ম হয়েছে। প্রস্তাবিত নিয়ম যথাযথভাবে কার্যকর করা গেলে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় কিছুটা স্বচ্ছতা আসতে পারে।